সোজা একটা কথা বলি, প্যাঁচানোর দরকার নেই।
প্রতিদিন দরজায় দাঁড়িয়ে হাসিমুখে বাচ্চাকে বিদায় দেওয়া, ব্যাকপ্যাকটা গুছিয়ে দেওয়া কিংবা রিকশায় তুলে দিয়ে একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলা, প্রতিটি মা-বাবার কাছেই এটা খুব স্বাভাবিক এক দৃশ্য।
কিন্তু এই স্বাভাবিক পরিবেশটার আড়ালেই এখন চরম অস্বাভাবিক এক বাস্তবতা ফুঁসে উঠছে। আজ সকালে যাকে পরম নিশ্চিন্তে বিদায় দিলেন, সমাজের কিছু কুৎসিত বিকৃত মানুষের চক্রান্ত থেকে সে কতটা নিরাপদ, সে হিসাব কি আমরা সত্যি কখনো মিলিয়ে দেখেছি?
আমরা অভিভাবকেরা আসলে এক অদৃশ্য ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে আছি। মনে করি বিপদ শুধু খবরেই মানায়, আমাদের ড্রয়িংরুম পর্যন্ত তার ছায়া আসবে না। অথচ এই অসচেতনতার সুযোগেই আমাদের সন্তানদের শৈশব প্রতিদিন বিষাক্ত হয়ে উঠছে।
একটু ঠান্ডা মাথায় কথাগুলো শুনুন তো!
গত ৬টা মাসে এ দেশের কতগুলো শিশু নিখোঁজ হয়েছে, সেই খবর কি আমরা কেউ রাখি?
গায়েব! একটা-দুটো বাচ্চা নয়, খবরের কাগজ ও সংবাদমাধ্যমের রিপোর্ট বলছে সংখ্যাটা প্রায় ৩৪০০! প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৫৬৭ জন নিষ্পাপ শিশু হাওয়ায় মিলিয়ে যাচ্ছে!
আমরা কি একবারও অভিভাবক হিসাবে নিজের মনকে প্রশ্ন করেছি, এই নিষ্পাপ বাচ্চাগুলো আসলে কোথায় গেল? এরা কি তবে আন্তর্জাতিক কোনো ঘৃণ্য পাচারচক্রের কিংবা বিকৃত মস্তিষ্কের কোন পশুর অদৃশ্য জালে আটকে গেল?
দাঁড়ান, আরও একটা তথ্য দেই। যে তথ্যটা জানার পর যেকোনো বিবেকবান মানুষের পিত্তি জ্বলে যাওয়ার কথা!
অনলাইনে শিশুদের দিয়ে বিকৃত ও নোংরা দৃশ্যে অভিনয় করানো, তাদের নিপীড়নের ছবি-ভিডিও ধারণ করা এবং এসব জঘন্য কর্মকাণ্ড কেনাবেচার দিক থেকে সমগ্র বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান আজ কত জানেন?
৫ম! ১, ২, ৩, ৪, ৫....
ভয়াবহ এবং গা শিউরে ওঠার মতো ব্যাপার, তাই না?
এবার একদম সততার সাথে, নিজের বুকে হাত রেখে উত্তর দিন তো, আপনার-আমার ঘরের যে বাচ্চাটি হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যাচ্ছে কিংবা যে শিশুটি স্কুল থেকে ফিরে ইদানীং কেমন যেন চুপচাপ আর থমথমে হয়ে থাকে... সে-ও কি এই নোংরা সিন্ডিকেটের অমানবিক চক্রান্তের শিকার হচ্ছে না?
আপনি কি শতভাগ নিশ্চিত বলতে পারবেন? আমি অন্তত নিশ্চিত নই। কারণ, এই অন্ধকারের চক্রান্ত কতটা গভীরে শিকড় ছড়িয়েছে, তার খবর আমরা অভিভাবকরা রাখিই না!
এই অবস্থা একদিনে হয়নি। একদিকে আমাদের পারিবারিক চরম শিথিলতা আর 'কিছু হবে না' মার্কা উদাসীনতা, অন্যদিকে রাষ্ট্রের ঢিলেঢালা ভাব আর বিচারহীনতা—এই দুই ফাঁক গলেই অপরাধীরা আজ মাথায় উঠে বসেছে।
তারা জেনে গেছে, বাচ্চাদের সাথে যা-ই করা হোক, অভিভাবকরা চুপ থাকে, প্রশাসনও অন্ধের মতো বসে থাকে।
আমি কত বছর ধরে এসব নিয়ে চিৎকার করছি! কত সেমিনারে বলেছি, গ্রুপে লিখে লিখে হাত ব্যথা করে ফেলেছি, পোস্টের পর পোস্ট দিয়েছি। বারবার একটা কথাই বলেছি, বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি আগের মতো নেই।
এখন চেনা সুরত, মিষ্টি কথা আর তথাকথিত 'ভদ্রলোক' রূপের পেছনে লুকিয়ে থাকে আস্ত একটা করে রক্তচোষা হায়েনা।
কিন্তু আফসোস! লোকে বিষয়টাকে সিরিয়াসলি নেয়নি। অনেকে ভেবেছে এগুলো নাকি ওভার-রিয়েকশন! বাচ্চার সামনে এসব কথা বললে নাকি তাদের মন নষ্ট হয়ে যাবে!
আরে ভাই! চেনা স্পর্শ আর ভুল স্পর্শের তফাতটা বাচ্চা না চিনলে তার জীবনই তো শেষ হয়ে যাবে, মন বাঁচিয়ে করবেন টা কী?
সন্তানকে ভালো জামা কিনে দেওয়া, দামি স্কুলে পাঠানো আর ভালো খাওয়ালেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। তাকে শেখাতে হবে কীভাবে সে নিজেকে রক্ষা করবে। চেনা বা অচেনা মানুষ ভুল উদ্দেশ্যে স্পর্শ করলে কীভাবে থমকে না গিয়ে শক্ত গলায় 'না' বলবে, তা তাকে শিখিয়ে দেওয়াটাই আজকের দিনে সবচেয়ে বড় অভিভাবকত্ব।
রাষ্ট্র তার দায়িত্ব কতটুকু পালন করবে সেটা তাদের বিষয়, কিন্তু আপনার ঘরের বাচ্চার সুরক্ষার প্রথম এবং শেষ দায়িত্বটা কিন্তু আপনার নিজের।
এখনই জেগে উঠুন। বাচ্চার সাথে বসুন, তার বন্ধু হোন। তাকে শেখান কোনটা নিরাপদ আর কোনটা অনিরাপদ। তাকে বিশ্বাসটা দিন যে, দুনিয়ার যেকোনো পরিস্থিতিতে সে যেন প্রথম এসে আপনাকে বলতে পারে।
ঝড় কিন্তু আপনার দরজায় কড়া নাড়া শুরু করে দিয়েছে। কাল যেন কোনো অপ্রিয় সত্য এসে আপনার পুরো সংসারটাকে ধূলিসাৎ করে না দেয়। সময় শেষ হওয়ার আগেই সচেতন হন!