"মা, আকাশটা নীল কেন?"
"বাবা, পিঁপড়ার কি নাক আছে? ওরা কি আমাদের মতো কথা বলে না?"
"চাঁদটা রোজ রাতে আমাদের সাথে হাঁটে কেন? ও কি আমাদের সাথে লুকোচুরি খেলে?"
সকাল থেকে রাত। দিন গড়িয়ে সন্ধ্যা কিংবা নিঝুম মধ্যরাত।
খাবার টেবিলে চামচ নাড়তে নাড়তে প্রশ্ন, রিকশায় চড়ে স্কুলে যাওয়ার পথে চারপাশের জটলা দেখে প্রশ্ন, আবার রাতে ঘুমানোর আগে সব আলো নিভিয়ে দেওয়ার পরও অন্ধকার ঘরের মাঝে ফিসফিস করে প্রশ্ন।
বাচ্চাদের এই প্রশ্নের যেন কোনো শেষ নেই। কোনো বিরতি নেই, কোনো নির্দিষ্ট সময়সূচি নেই। যেন এক অবিরাম চলা প্রশ্নবাণ!
আর সারাদিনের অফিস, সংসারের হাজারো কাজ আর দুনিয়াবি ব্যস্ততায় ক্লান্ত-শ্রান্ত মা কিংবা বাবার মুখ থেকে একসময় দীর্ঘশ্বাস আর তীব্র বিরক্তির মিশেলে বেরিয়ে আসে সেই চিরচেনা ধমক, একটু চুপ থাকো তো!
সারাক্ষণ খালি প্যানপ্যান আর প্রশ্ন! মুখটা কি তোমার একটুও বন্ধ থাকে না? বিরক্ত করে একদম মাথাটা খাইয়া ফেললো!
কথাটা বলেই হয়তো আপনি আপনার কাজে মন দিলেন, কিংবা মেজাজ বিগড়ে গিয়ে বাচ্চাকে অন্য ঘরে পাঠিয়ে দিলেন। শিশুটিও তার ফুটন্ত কৌতূহলের মুখটা বুজে মাথা নিচু করে চলে গেল।
কিন্তু সম্মানিত অভিভাবক একটু থামুন। গভীর একটা শ্বাস নিন। একটু ভাবুন তো, আমরা আসলে কী করলাম?
আজকের এই ক্লান্তিকর দুপুরে বা নিঝুম রাতে যে অবিন্যস্ত 'কেন' শব্দটা আপনার কান ঝালাপালা করে দিচ্ছে, ওটা কি আসলেই কোনো বিরক্তি উৎপাদনকারী লযন্ত্রের শব্দ?
না, একদমই নয়।
ওটা হলো আপনার সন্তানের ভেতরে লুকিয়ে থাকা সুপ্ত প্রতিভার আত্মপ্রকাশের ডাক। ওটা তার মস্তিষ্কের বন্ধ দুয়ারগুলোতে সজোরে আঘাত করার শব্দ। ওটা তার ভেতরে একটা নতুন পৃথিবী চেনার আগুন জ্বলে ওঠার প্রথম আওয়াজ!
আপনি যখন তীব্র বিরক্তি নিয়ে কিংবা অহেতুক রেগে গিয়ে আজ এই আওয়াজটা জোর করে চেপে দেন, তখন আপনি শুধু একটা শিশুর মুখ বন্ধ করছেন না; বরং অজান্তেই নিভিয়ে দিচ্ছেন এমন এক স্ফুলিঙ্গ, যা কাল হয়তো আপনার এই সন্তানকেই একজন যুগশ্রেষ্ঠ গবেষক, একজন প্রজ্ঞাবান গভীরজ্ঞানী আলেম, একজন দূরদর্শী চিন্তাবিদ কিংবা মানবকল্যাণে নিয়োজিত কোনো মহান ব্যক্তিত্ব বানিয়ে দিতে পারতো।
আমরা কত সহজে বলি, বাচ্চাটা বড়ই ডিস্টার্ব করে!
অথচ আমরা টের পাই না, এই ডিস্টার্ব আসলে তার ব্রেন প্রসেসিংয়ের এক অদ্ভুত প্রক্রিয়া। তার চোখের সামনের এই বিশাল ও জটিল মহাবিশ্বটাকে সে বুঝতে চাইছে, চিনতে চাইছে। সে জানতে চাইছে তার স্রষ্টাকে, তার চারপাশের প্রকৃতিকে।
সন্তানের এই অদম্য জিজ্ঞাসাকে আমরা যদি প্রতিদিন বিরক্তি দিয়ে শাসন করি, তবে আমরা তাকে একটা নির্দিষ্ট ছাঁচে বন্দি করে ফেলি। সে প্রশ্ন করা বন্ধ করে দেয়, আর প্রশ্ন করা বন্ধ করা মানেই হলো চিন্তা করা বন্ধ করে দেওয়া।
আজকের আলোচনায় আমরা মূলত সেই সূক্ষ্ম মনস্তত্ত্ব এবং দ্বীনি দৃষ্টিকোণ নিয়ে কথা বলব, কীভাবে আমাদের একটু ধৈর্য, একটু সহমর্মিতা আর সঠিক দিকনির্দেশনা সন্তানের ভেতরের এই বুদ্ধিবৃত্তিক আগুনকে নিভে যাওয়া থেকে রক্ষা করতে পারে এবং তাকে নিয়ে যেতে পারে সাফল্যের সর্বোচ্চ শিখরে।
পরবর্তী পর্ব আগামীকাল ইনশা'আল্লাহ
শিশুর মস্তিষ্কে এক আশ্চর্য 'জিনিয়াস স্টেট'
আধুনিক শিশু-মনোবিজ্ঞান (Child Psychology) এবং নিউরোসায়েন্সের (Neuroscience) গবেষণাপত্রগুলোর দিকে যদি আমরা একটু নজর দেই, তবে এক বিস্ময়কর সত্য আমাদের সামনে এসে দাঁড়ায়। বিজ্ঞানীরা বলছেন, একটা শিশু যখন কোনো কিছু নিয়ে তীব্র কৌতূহল বোধ করে, যখন সে বড় বড় চোখ করে একের পর এক প্রশ্ন করতে থাকে, তখন তার মস্তিষ্ক সাধারণ অবস্থায় থাকে না। মস্তিষ্ক তখন প্রবেশ করে এক বিশেষ ও অতি-সক্রিয় স্তরে, যাকে বিশেষজ্ঞরা নাম দিয়েছেন "Genius State" বা সুপ্ত প্রতিভার জাগ্রত রূপ।
বিষয়টা একটু সহজ করে বলি। ধরুন, একটা শুকনো স্পঞ্জকে পানিতে ডুবিয়ে দিলে সে যেমন মুহূর্তের মধ্যে হুড়হুড় করে পানি শুষে নেয়, কৌতূহলী শিশুর মস্তিষ্কও ঠিক সেরকম কাজ করে। এই জিনিয়াস স্টেট-এ থাকার সময় শিশুর মস্তিষ্কের নিউরনগুলো (স্নায়ুকোষ) অবিশ্বাস্য গতিতে ছুটতে থাকে। একটা নিউরন আরেকটা নিউরনের সাথে যুক্ত হয়ে সেকেন্ডের ভগ্নাংশে তৈরি করে শত শত নতুন (Synapses) বা সংযোগ। এই সংযোগগুলোই হলো শিশুর মেধা, বুদ্ধিমত্তা আর চিন্তাশক্তি বিকাশের মূল ভিত্তি।
আধুনিক বিজ্ঞান বলছে, কৌতূহল হলো শিশুর ব্রেনের প্রধান জ্বালানি। একটার পর একটা প্রশ্নের উত্তর খোঁজার যে রোমাঞ্চকর যাত্রা, তা তার মস্তিষ্ককে আরও শক্তিশালী, আরও ধারালো করে তোলে।
আপনি যখন তার প্রশ্নের সুন্দর একটা উত্তর দেন, তখন তার ব্রেনের ওই সংযোগগুলো মজবুত হয়। আর আপনি যখন ধমক দিয়ে তাকে থামিয়ে দেন, তখন সেই সংযোগগুলো ভেঙে যায়। শিশুটির মানসিক বিকাশ ওই মুহূর্তেই হোঁচট খায়।
আমাদের প্রিয় নবী রাসূলুল্লাহ ﷺ সাড়ে চৌদ্দশো বছর আগেই আমাদের শিখিয়ে গেছেন, "জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মুসলিমের উপর ফরজ।" — (সুনানে ইবনে মাজাহ: ২২৪)
এখন প্রশ্ন হলো, একটা ছোট শিশু কীভাবে জ্ঞান অর্জন শুরু করবে? তার তো শুরুতেই বই পড়ে বোঝার বয়স হয়নি!
উত্তর হলো, তার জ্ঞান অর্জনের প্রথম ও প্রধান চাবিকাঠিই হলো 'প্রশ্ন করার সাহস'। প্রশ্ন হলো জ্ঞানের দরজা। যে শিশু প্রশ্ন করতে ভয় পায়, ধমকের চোটে যার কৌতূহল গুটিয়ে যায়, সে তো জ্ঞানের মূল দরজাতেই কখনো পৌঁছাতে পারে না।
চলুন, সাড়ে ১৪০০ বছর আগের মদিনার আরো একটি দৃশ্যে ফিরে যাই। আপনার কি সেই ছোট্ট ছেলেটির কথা মনে আছে, যার নাম আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)?
বয়সে নিতান্তই শিশু, কিন্তু চোখে-মুখে ছিল তার রাজ্যের কৌতূহল। তিনি যখন ছোট ছিলেন, তখন সারাক্ষণ নবীজি ﷺ-এর আশেপাশে ছায়ার মতো ঘুরঘুর করতেন। নবীজি কখন কী করছেন, কীভাবে মানুষের সাথে কথা বলছেন, কেমন করে অজু করছেন, গভীর রাতে উঠে কেমন করে তাহাজ্জুদে দাঁড়াচ্ছেন—সবকিছু তিনি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতেন। আর মনে প্রশ্ন জাগলেই ছুটে যেতেন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ শিক্ষকটির কাছে।
একবার রাতের বেলা নবীজি ﷺ তাহাজ্জুদ পড়তে উঠবেন, ছোট্ট ইবনে আব্বাস আগেই গিয়ে অজুর পানি এগিয়ে দিলেন। নবীজি অবাক হলেন। এই বয়সের একটা বাচ্চা ঘুমে অচেতন থাকার কথা, সে কিনা এত রাতে জেগে আছে এই ইলম শেখার জন্য!
আমাদের সময়ের কোনো বাবা বা অভিভাবক হলে হয়তো বলতেন, অ্যাই ছাঁওয়াল! এত রাতে এখানে কী করিস? যা, গিয়ে ঘুমা। সারাক্ষণ খালি ডিস্টার্ব করিস!
কিন্তু আমাদের নবীজি ﷺ কি কখনো বিরক্ত হয়েছিলেন? তিনি কি কখনো বলেছিলেন, যাও তো এখান থেকে, বড়দের কাজে নাক গলাবে না?
না, একদমই না! বরং শিশু ইবনে আব্বাসের এই প্রবল কৌতূহল আর শেখার আগ্রহ দেখে নবীজি ﷺ-এর হৃদয় জুড়িয়ে গেল। তিনি পরম মমতায় সেই কৌতূহলী বালককে বুকে টেনে নিলেন। আদর করে তার মাথায় হাত বুলিয়েআ আসমানের দিকে তাকিয়ে এক ঐতিহাসিক দো'আ করলেন: "আল্লাহুম্মা ফাক্কিহহু ফিদ-দ্বীন, ওয়া আল্লিমহুত-তা'বীল।"
"হে আল্লাহ! তাকে দ্বীনের গভীর প্রজ্ঞা দান করো এবং তাকে কুরআনের সঠিক ব্যাখ্যা (তাফসির) শেখাও।" (সহিহ বুখারি: ১৪৩)
ফলাফল কী হয়েছিল জানেন? নবীজির সেই আদর, প্রশ্রয় আর প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার স্বাধীনতা—সেই ছোট্ট কৌতূহলী শিশুটিকে পরবর্তীতে পরিণত করেছিল এই উম্মতের সবচেয়ে বড় মুফাসসির ও জ্ঞানের এক মহাসমুদ্রে!
কেন এমন হলো? কারণ, ছোট্ট বয়সে তাঁর চারপাশের মানুষগুলো তাঁর মনের শিশুসুলভ প্রশ্নগুলোকে বিরক্তির বোঝা না ভেবে, সম্মান জানাতে শিখেছিলেন। তাঁর কৌতূহলের আগুনে তারা পানি ঢেলে দেননি, বরং ভালোবাসার বাতাস দিয়ে সেই আগুনকে প্রজ্ঞার আলোয় রূপান্তর করেছিলেন।
এখন, দিনের শেষে যখন চারপাশটা শান্ত হয়ে আসে, নির্জন সেই মুহূর্তে নিজেকে একটা প্রশ্ন করুন। আপনার বুকের ধন, আপনার আদরের সন্তান যখন তার ছোট্ট মাথায় আসা অদ্ভুত, বোকা বোকা বা অহেতুক মনে হওয়া প্রশ্নগুলো নিয়ে আপনার সামনে এসে দাঁড়ায়—আপনি কী করেন?
আপনি কি তাকে আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাসের মতো ডানা মেলে ওড়ার সুযোগ দিচ্ছেন? নাকি নিজের ক্লান্তি আর বিরক্তির অজুহাতে প্রতিদিন তার কৌতূহলের জ্বলন্ত আগুনে নিজ হাতে পানি ঢেলে দিচ্ছেন?
মনে রাখবেন, আজ আপনি যে প্রশ্নটিকে ধমক দিয়ে থামিয়ে দিলেন, হয়তো সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার যাত্রাতেই লুকিয়ে ছিল আগামী দিনের কোনো এক মহান বিজ্ঞানীর আবিষ্কার, কিংবা কোনো এক প্রজ্ঞাবান আলেমের জন্ম।