আমরা যেভাবে অজান্তেই সন্তানের কৌতূহলের স্ফুলিঙ্গটা নিভিয়ে দিই
আমরা অনেক সময় ভাবি, সন্তানকে তো ভালো স্কুলে পড়াচ্ছি, দামি টিউটর রেখে দিয়েছি, রঙিন বই কিনে দিচ্ছি; তাহলে আর সমস্যা কোথায়?
কিন্তু আমরা খেয়ালই করি না, প্রতিদিনের জীবনযাত্রায় আমাদের অতি সাধারণ কিছু রুক্ষ আচরণ কীভাবে একটা শিশুর স্বাভাবিক বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশকে ভেতর থেকে দুমড়ে-মুচড়ে দেয়।
আসুন, আমাদের চেনা-জানা বাংলাদেশি পরিবারের ৩টি অত্যন্ত পরিচিত দৃশ্য খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করি।
• দৃশ্য ১ (রান্নাঘর): মা চুলার পাশে দুপুরের রান্না নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত। গরম তেল আর তরকারির ধোঁয়ায় ঘর ভর্তি। এমন সময় ৭ বছরের ছেলেটা কৌতুহল ভরা চোখে রান্নাঘরে এসে কড়াইয়ের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো, আম্মু, পানি গরম হলে শক্ত চালগুলো কেন তুলতুলে নরম হয়ে যায়? মা কাজের চাপে বিরক্ত হয়ে হাত থেকে খুন্তিটা ধপ করে রেখে বললেন, ভাগ তো এখান থেকে! কাজের সময় এসে খালি ক্যাঁচক্যাঁচ করবা না! যা ভাগো, পড়তে বসো গে!
• দৃশ্য ২ (ড্রয়িংরুম): বাসায় মেহমান এসেছেন। নাস্তা সাজানো হচ্ছে, বড়রা কথা বলছেন। ৩ বছরের ছোট্ট আয়িশা তার নতুন একটা খেলনা গাড়ি হাতে নিয়ে খালামণির কাছে গিয়ে বারবার প্রশ্ন করছে,খালামণি, এটা কীভাবে চলে জানো? এটার ভেতরে কে বসে থাকে?বাবা দূর থেকে চোখ রাঙিয়ে, গম্ভীর গলায় ধমক দিয়ে বললেন, এই আয়িশা, একদম চুপ! বড়দের সামনে এত কথা বলতে হয় না। থার্ড ক্লাস স্বভাব! চুপচাপ এক কোণে গিয়ে বসে থাকো!
• দৃশ্য ৩ (শোবার ঘর): বাবা সোফায় আধশোয়া হয়ে মোবাইলের স্ক্রিন স্ক্রল করছেন, ফেসবুকে একের পর এক রিলস দেখে চলছেন। ১০ বছরের ছেলেটা কাছে এসে খুব কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করলো, বাবা, আমরা রমজান মাসে কেন সারাদিন না খেয়ে থাকি? আল্লাহ তো আমাদের অনেক ভালোবাসেন, তবে আমাদের কেন খালি পেটে থাকতে হয়? বাবা মোবাইল থেকে চোখ না তুলেই, সামান্য বিরক্ত হয়ে বললেন, ধুর! এখন ঘ্যানঘ্যান কোরো না তো! বড় হলে নিজে নিজেই বুঝবে। যাও, নিজের ঘরে যাও!
এই ৩টি দৃশ্যেই আড়ালে প্রকৃতপক্ষে কী ঘটে গেল?
বাহ্যিকভাবে মনে হতে পারে, বাচ্চারা একটু বেশি কথা বলছিল, মা-বাবা কাজের ব্যস্ততায় একটু বকে দিয়েছেন।
এতে আবার কী এমন সমস্যা হলো?
কিন্তু আসুন, আরো গভীরে গিয়ে ঘটনাগুলোর ভেতরের ক্ষতিটা দেখি।
এই তিনটা দৃশ্যেই আপনার সন্তান আপনার কাছে কোনো সাধারণ আবদার নিয়ে আসেনি। সে তার ছোট্ট কোলের ভেতর 'কৌতূহল' নামক একটা সদ্য ফোটা তাজা গোলাপ নিয়ে এসেছিল। সে আশা করেছিল, তার সবচেয়ে প্রিয় মানুষ দুটি—তার মা কিংবা তার বাবা—এই গোলাপটির ঘ্রাণ নিবেন, সেটিকে আদর করবেন। কিন্তু আমরা আমাদের ক্লান্তি, কাজের চাপ আর অহেতুক ইগোর বুট জুতো দিয়ে সেই ফুটন্ত গোলাপটিকে নিমিষেই দলে-পিষে ধ্বংস করে দিলাম।
মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে এই মুহূর্তগুলোতে শিশুর মস্তিষ্কে ৩টি ভয়াবহ আঘাত ঘটে:
১. আত্মবিশ্বাসের পতন (Self-Doubt & Low Self-Esteem): শিশু যখন তার কৌতূহল নিয়ে মা-বাবার কাছে আসে, তখন সে ধরে নেয় মা-বাবাই তার পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়। কিন্তু সেই নিরাপদে আশ্রয়ে এসে যখন সে হুট করে ধমক খায়, তখন সে ধরে নেয়, তার চিন্তাটিই হয়তো ভুল, অন্যায় বা মারাত্মক কোনো অপরাধ ছিল!
সে ভাবতে শুরু করে, আমি মনে হয় কোনো বোকা প্রশ্ন করে ফেলেছি, আমার বোধহয় কোনো আক্কল-জ্ঞান নেই। এভাবে প্রতিদিন একটু একটু করে তার নিজের বুদ্ধিমত্তার ওপর আস্থা কমতে থাকে। ফলশ্রুতিতে শিশু নিজেকে চারপাশের সমাজ থেকে গুটিয়ে নিতে শুরু করে এবং এক সময় চরম হীনমন্যতায় ভুগতে থাকে।
২. শেখার আনন্দ নষ্ট হওয়া ও নিউরো-রাসায়নিক বিপর্যয় (Neuro-chemical Impact): মনোবিজ্ঞানের ভাষায়, নতুন কিছু শেখার এবং জানার ভেতরে এক অদ্ভুত আত্মতৃপ্তি রয়েছে। শিশু যখন কৌতূহল নিয়ে প্রশ্ন করে এবং তার সঠিক উত্তর পায়, তখন তার মস্তিষ্কে ‘ডোপামিন’ (Dopamine) নামক এক বিশেষ আনন্দের হরমোন নিঃসৃত হয়। এই ডোপামিনই তাকে জীবনের যেকোনো বিষয় শেখার প্রতি আগ্রহী ও উৎসাহিত করে তোলে।
কিন্তু আমরা যখন তাকে ধমক দিয়ে তাড়িয়ে দেই, তখন সেই ডোপামিনের আনন্দময় প্রবাহ মুহূর্তেই থেমে যায়। উল্টো তার মস্তিষ্কে নিঃসৃত হতে শুরু করে তীব্র মানসিক চাপের হরমোন—‘কর্টিসল’ (Cortisol)।
ফলাফল কী হয় জানেন? নতুন কিছু জানার বা পড়ালেখার যে বিষয়টি এতক্ষণ তার কাছে আনন্দময় খেলা ছিল, তা পরিণত হয় ভয় আর আতঙ্কের এক বিভীষিকায়। পরবর্তীতে পড়াশোনা বা নতুন বিষয় শেখা তার কাছে আর আনন্দের বিষয় থাকে না, বরং হয়ে দাঁড়ায় এক যন্ত্রণাদায়ক বাধ্যবাধকতা।
৩. অভিভাবকের সাথে মানসিক দূরত্বের সৃষ্টি (Emotional Detachment): শৈশবে মা-বাবার কাছে যে প্রশ্নগুলো ধমক খেয়ে ফিরে আসে, সেগুলো কিন্তু হাওয়ায় মিলিয়ে যায় না; বরং মা-বাবা ও শিশুর মাঝখানে এক বিশাল অদৃশ্য দেয়াল তৈরি করে।
শিশুটি আস্তে আস্তে মা-বাবার ওপর থেকে তার মৌলিক ভরসা হারিয়ে ফেলে। সে মনে মনে সিদ্ধান্ত নেয়,মা-বাবাকে নিজের মনের কথা বলতে নেই, বললে কেবল বকা আর অপমানই জোটে।
এই যে শৈশবে তৈরি হওয়া দূরত্ব, এটার মাশুল অভিভাবকদের গুনতে হয় সন্তান কিশোর বা তরুণ বয়সে পৌঁছালে। বড় হয়ে যখন সে কোনো জটিল জীবনসংকটে পড়বে, কোনো বুলিং বা সাইবার ক্রাইমের শিকার হবে কিংবা মারাত্মক ভুল সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হবে, তখন সে আর সাহায্য চাইতে মা-বাবার কাছে আসবে না। কারণ সে তো শৈশবেই শিখে গেছে—নিজের ভেতরের প্রশ্ন বা সংশয় মা-বাবার সামনে প্রকাশ করলে সমবেদনা নয়, কেবল ধমকই পাওয়া যায়!
যখন এই ঘটনাগুলোর পুনরাবৃত্তি ঘটতে থাকে—একদিন, দুদিন, এক মাস, এক বছর, বছরের পর বছর—তখন শিশুটি তার অন্তরে একটা চূড়ান্ত ও অত্যন্ত বিপজ্জনক সিদ্ধান্তে পৌঁছায়:
"প্রশ্ন করা একটা গুরুতর অপরাধ। নতুন কিছু জানতে চাওয়া মানেই বকা খাওয়া, লজ্জিত হওয়া আর অপমানিত হওয়া।"
ব্যস! শিশুটি ঠিক ওই মুহূর্তেই চিরতরে প্রশ্ন করা বন্ধ করে দেয়। আর শিশু-মনোবিজ্ঞানের এক নিষ্ঠুর সত্য হলো, যে শিশু প্রশ্ন করা বন্ধ করে দেয়, সে আসলে চিন্তা করাও বন্ধ করে দেয়।
যে প্রদীপে সুজ্ঞান আর বিশ্বজয়ের আলো জ্বলে ওঠার কথা ছিল, আমাদের সামান্য অধৈর্য, বিরক্তি আর রুক্ষ আচরণের এক ঝাপটা বাতাসে সেই প্রদীপটি নিভে যায়। আর সেখানে ধীরে ধীরে জাঁকিয়ে বসে অজ্ঞতা ও চিন্তাহীনতার এক চিরস্থায়ী অন্ধকার!