শিশুর কৌতূহলের আগুন জ্বালিয়ে রাখার ৪টি কার্যকর পদক্ষেপ
পূর্বের আলোচনায় আমরা যে ৩টি হতাশাজনক দৃশ্য দেখেছি, সেগুলোকে যদি আমরা একটু প্রজ্ঞা, একটু ভালোবাসা আর ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে নতুন করে সাজাই, তবে দৃশ্যপট ঠিক কতটা বদলে যেতে পারে—আসুন তা একনজরে দেখে নেই।
দৃশ্য ১: ছেলে যখন এসে জিজ্ঞেস করলো চাল কেন নরম হয়, মা সাথে সাথে রান্নার কাজ সামান্য হাত থামিয়ে ছেলের দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন, মাশা'আল্লাহ! কী দারুণ আর বুদ্ধিমানদের মতো একটা প্রশ্ন করেছ তো! আচ্ছা, তুমি কী মনে করো—গরম পানি আর আগুনের তাপে চালের ভেতরে কী ঘটে থাকতে পারে? ছেলেটি চোখ বড় বড় করে চিন্তা করতে লাগলো। মা তাকে তড়িঘড়ি না করে ভাবার সময় দিলেন। ছেলে যখন তার মতো করে একটা কাল্পনিক ব্যাখ্যা দিল, মা পরম মমতায় তাকে প্রশংসা করলেন। তারপর সহজ ভাষায় বুঝিয়ে বললেন, তাপ আর পানির সংমিশ্রণে চালের ভেতরের শ্বেতসার কীভাবে নরম হয়ে ভাত তৈরি করে।
দৃশ্য ২ : ড্রয়িংরুমে মেহমানের সামনে মেয়েটি যখন খেলনা নিয়ে খালাকে প্রশ্ন করছিল, বাবা তখন ধমক না দিয়ে হেসে বললেন,আম্মু, খালামণি তো দূর থেকে জার্নি করে এসে ক্লান্ত, তুমি নাস্তাটা খেয়ে নাও। একটু পর আমরা সবাই মিলে তোমার এই খেলনা গাড়ির রিমোট আর ইঞ্জিন কীভাবে কাজ করে তা খালামণির কাছ থেকে বুঝে নেব, ঠিক আছে?"
এতে শিশুটি অপমানিত বোধ করলো না, বরং নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ ভেবে চুপচাপ অপেক্ষা করতে রাজি হয়ে গেল।
দৃশ্য ৩ : রোজা নিয়ে ছেলে যখন প্রশ্ন করলো, বাবা সাথে সাথে হাতের মোবাইলটা পাশে সরিয়ে রাখলেন। ছেলের কাঁধে হাত রেখে, চোখে চোখ মিলিয়ে বললেন, চলো, আজ ইফতারের ঠিক ১০ মিনিট আগে আমরা দুজন একসাথে বসে এই রহস্যটা উন্মোচন করবো।
বিকেলে ইফতারির টেবিলে বসে বাবা খোশগল্পের ছলে তাকে বোঝালেন ধৈর্য, তাকওয়া আর সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের ক্ষুধার কষ্ট অনুভবের মহান শিক্ষা।
পার্থক্যটা খেয়াল করেছেন?
কাজের চাপ কিন্তু কমে যায়নি, সময়ও খুব বেশি লাগেনি। শুধু আমাদের মানসিকতা ও দৃষ্টিভঙ্গিটুকু একটু বদলে গেছে! প্রথম ক্ষেত্রে আমরা বাচ্চার মনের কৌতূহলকে নিভিয়ে দিয়েছিলাম, আর দ্বিতীয় ক্ষেত্রে সেই কৌতূহলকে জ্ঞান ও ভালোবাসার প্রদীপে রূপান্তর করলাম।
সন্তানের মনের এই জানার অদম্য আগ্রহ ও সুপ্ত প্রতিভাকে আজীবন বাঁচিয়ে রাখার জন্য একজন সচেতন অভিভাবক হিসেবে প্রতিদিন নিয়মিত এই ৪টি কাজ করুন:
১. আল্লাহর দরবারে অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে শুকরিয়া জানান: সন্তান যখন অদ্ভুত বা অবিন্যস্ত কোনো প্রশ্ন নিয়ে আপনার সামনে এসে দাঁড়াবে, বিরক্তি প্রকাশের আগে মনে মনে পাঠ করুন—"আলহামদুলিল্লাহ"।
কারণ, আল্লাহ তাআলা আপনার সন্তানকে কোনো মানসিক প্রতিবন্ধকতা দেননি। তার মস্তিষ্ক সুস্থ, সজীব, সচল এবং সঠিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে বলেই তার মনে প্রশ্ন জাগছে! যেসব মা-বাবাদের সন্তান স্বাভাবিকভাবে চিন্তা করতে পারে না বা কথা বলতে পারে না (বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন), তাদের কষ্টের কথা একবার ভাবুন তো?
সন্তানের প্রশ্ন করাটা কোনো ঝক্কি বা বিরক্তির কারণ নয়, বরং এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে পাওয়া এক অপার নিয়ামত ও তার বুদ্ধিমত্তার বড় নিদর্শন। তাই সন্তান প্রশ্ন করলেই বিরক্ত না হয়ে মনে মনে আল্লাহ তা'আলার দরবারে কৃতজ্ঞতা আদায় করুন।
২. ধৈর্যের সর্বোচ্চ পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করুন: একটি শিশু যখন এই বিশাল পৃথিবীতে জন্ম নেয়, তার কাছে সবকিছুই নতুন, অদ্ভুত আর জাদুকরী। আমরা যা প্রতিদিন দেখে দেখে অভ্যস্ত হয়ে গেছি—যেমন বৃষ্টি হওয়া, পিঁপড়ার সারি বেঁধে হাঁটা, কিংবা সূর্যাস্ত যাওয়া ইত্যাদি শিশুর কাছে তার প্রতিটিই এক একটি নতুন বিস্ময়!
তাই সে হয়তো একই প্রশ্ন আপনাকে দশবার জিজ্ঞেস করতে পারে। একই বিষয় নিয়ে বারবার জানতে চাইতে পারে।এখানে অধৈর্য হওয়া যাবে না। শিশু-মনোবিজ্ঞান বলে, পুনরাবৃত্তি (Repetition) হলো শিশুর শেখার একটা বড় মাধ্যম। রাগ বা বিরক্তি না দেখিয়ে হাসিমুখে পরম ধৈর্যের সাথে উত্তর দিন।
মনে রাখবেন, আপনার দেওয়া এই ধৈর্যশীল উত্তরগুলোই তার মস্তিষ্কে মা-বাবার প্রতি আজীবন ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার ভিত্তি গড়ে দেয়।
৩. সঙ্গে সঙ্গে উত্তর না চাপিয়ে দিয়ে তাকে ভাবতে দিন: আমাদের অনেকেরই একটা অভ্যাস আছে—বাচ্চা কোনো প্রশ্ন করলেই আমরা সাথে সাথে বিজ্ঞান বইয়ের মতো কঠিন কোনো সংজ্ঞা বা রেডিমেড তথ্য তার মুখে তুলে দিই। এটা কিন্তু শিশুর চিন্তাশক্তি বিকাশের জন্য খুব একটা উপকারী নয়।
সন্তান যখন কোনো প্রশ্ন করবে, সরাসরি উত্তর না দিয়ে উল্টো তাকেই হেসে জিজ্ঞেস করুন: মাশা'আল্লাহ! বেশ মজার প্রশ্ন তো! আচ্ছা, তুমি নিজে কী মনে করো, বাবা/মা? এটা কেন হতে পারে বল তো?
এই একটি ছোট প্রশ্ন বাচ্চার মস্তিষ্কে ম্যাজিকের মতো কাজ করে! তার ব্রেনের নিউরনগুলো হঠাৎ করেই দারুণ সক্রিয় হয়ে ওঠে। সে তার আগের সমস্ত অভিজ্ঞতা, কল্পনা আর বুদ্ধি এক জায়গায় এনে একটা উত্তর তৈরি করার চেষ্টা করে।
সে ভুল বলুক কিংবা অদ্ভুত কিছু বলুক, তাকে বলতে দিন। তার এই নিজে নিজে ভাবার চেষ্টাটুকুই মূলত তার চিন্তাশক্তিকে ধারালো করে তোলে। সে যখন নিজের মতো একটা উত্তর তৈরি করবে, এরপর আপনি সঠিক ব্যাখ্যাটি বুঝিয়ে দিন।
৪. প্র্যাক্টিক্যালি বা প্রাত্যহিক অভিজ্ঞতার মাধ্যমে উত্তর খোঁজার সংস্কৃতি গড়ে তুলুন: বইয়ের পাতায় রিডিং পড়ে মুখস্থ করার চেয়ে নিজের চোখে দেখে কিংবা হাতে-কলমে শিখে নেওয়া জ্ঞান মানুষের মস্তিষ্কে স্থায়ী হয়ে যায়।
বাচ্চা হয়তো রাতের ছাদে গিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো,"বাবা, চাঁদটা রোজ রাতে একরকম দেখায় না কেন? কোনো দিন গোল, আবার কোনো দিন বাঁকা কেন?"
আপনি তাকে বিজ্ঞানের কঠিন সংজ্ঞা মুখস্থ না করিয়ে ঘরে নিয়ে আসুন। ঘর অন্ধকার করে একটি টর্চলাইট আর একটি প্লাস্টিকের বল নিন। টর্চলাইটকে 'সূর্য' আর বলকে 'চাঁদ' বানিয়ে আলো-ছায়ার খেলাটা প্র্যাক্টিক্যালি তার সামনে উপস্থাপন করুন। দেখান কীভাবে আলোর কোণ পরিবর্তনের সাথে সাথে বলের একপাশে ছায়া পড়ে।
বিশ্বাস করুন, চোখ দিয়ে দেখে শেখা এই পাঠ সে জীবনের ৯০ বছর বয়সে গিয়েও কোনোদিন ভুলবে না!
পবিত্র কুরআনের দিকে তাকালে আমরা দেখব, আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পবিত্র কুরআনে শত শত বার বান্দাকে তাগিদ দিয়েছেন:
(আফালা তা'কিলুন?) — "তারা কি বুদ্ধিকে খাটাবে না?"
(আফালা তাতাফাক্কারুন?) — "তারা কি গভীর চিন্তা ও গবেষণা করবে না?"
ইসলাম কখনো অন্ধ অনুকরণ কিংবা চিন্তাহীনতাকে সমর্থন করে না। কুরআনের এই ‘তাফাক্কুর’ বা গভীর চিন্তাশীলতার তালিম আমাদের শিশুদের একদম ছোটবেলা থেকেই দিতে হবে। আর সেই তালিমের প্রথম ধাপই হলো—তাদের কৌতূহলকে শ্রদ্ধা জানানো এবং একসাথে উত্তর খুঁজে বের করার সুন্দর পরিবেশ তৈরি করা।